
বিশেষ প্রতিবেদক:সংসার সুখের হবে— এমন এক বুক আশা নিয়ে জীবনের বিভিন্ন সময়ে একে একে তিনটি বিয়ে করেছিলেন এক ব্যক্তি। তবে ভাগ্য তার সহায় হয়নি। শান্তির খোঁজ করতে গিয়ে উল্টো তার জীবন রূপ নিয়েছে এক জীবন্ত নরকে। তিন স্ত্রীর মানসিক চাপ আর ক্রমাগত পারিবারিক কলহে দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে তার। শেষমেশ স্ত্রীদের হাত থেকে সাময়িক মুক্তি পেতে এক অভিনব ও নজিরবিহীন পথ বেছে নিলেন এই ভুক্তভোগী। কোনো অভিযোগ বা মামলা করতে নয়, বরং নিজেকে কয়েক মাসের জন্য হাজতখানায় বন্দি করার অদ্ভুত এক আরজি নিয়ে তিনি হাজির হয়েছেন স্থানীয় থানায়।পারিবারিক সম্পর্কের চরম অবক্ষয় এবং এক ভুক্তভোগী স্বামীর অসহায়ত্বের এই চিত্রটি সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে।থানায় ঢুকে ওসির পা ধরে কান্নাকাটিপ্রত্যক্ষদর্শী ও থানা সূত্রে জানা যায়, ঘটনার দিন দুপুরের দিকে চোখে-মুখে তীব্র আতঙ্ক নিয়ে থানার ওসির (ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা) কক্ষে প্রবেশ করেন ওই ব্যক্তি। সেখানে ঢুকেই তিনি কোনো ভূমিকা ছাড়া কান্নায় ভেঙে পড়েন। কর্তব্যরত পুলিশ কর্মকর্তারা তাকে শান্ত করার চেষ্টা করলে তিনি তাদের কাছে এক অদ্ভুত দাবি উত্থাপন করেন। ওই ব্যক্তির স্পষ্ট কথা— "স্যার, আমাকে যেকোনো একটা মিথ্যা মামলা দিয়ে হলেও অন্তত ৩-৪ মাসের জন্য লক-আপে ভরে রাখুন। আমি এই কয়েকটা মাস একটু শান্তিতে ঘুমাতে চাই।"পুলিশ প্রথমে বিষয়টিকে পারিবারিক কোনো রসিকতা বা মানসিক ভারসাম্যহীনতার লক্ষণ মনে করলেও, ওই ব্যক্তির চোখে-মুখের ভীতি এবং আকুলতা দেখে বুঝতে পারে যে পর্দার আড়ালের গল্পটা অনেক বেশি বেদনার।সুখের খোঁজে তিন বিয়ে, অতঃপর ঘরেই বন্দিদশাপ্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে ওই ব্যক্তি তার জীবনের করুণ কাহিনী তুলে ধরেন। তিনি জানান, প্রথম ও দ্বিতীয় বিয়ের পর সংসারে নানা টানাপোড়েন শুরু হলে, কিছুটা মানসিক স্বস্তির আশায় তিনি পরবর্তীতে তৃতীয় বিয়েটি করেন। কিন্তু হিতে বিপরীত হয়ে তার জীবনে নেমে আসে চরম বিপর্যয়। তিন স্ত্রী মিলে তার ওপর শুরু করেন মনস্তাত্ত্বিক ও মানসিক নির্যাতন। প্রতিদিনকার তুচ্ছ ঘটনা নিয়ে ঝগড়াঝাঁটি, গালিগালাজ আর ক্রমাগত লাঞ্ছনায় তার নিজের ঘরই এখন তার কাছে একটি অবরুদ্ধ কারাগার মনে হয়। নিজ গৃহে নিরাপত্তার অভাব বোধ করায়, স্ত্রীদের চোখ ফাঁকি দিয়ে তিনি থানার অন্ধকার হাজতখানাকেই তার জন্য পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয় বলে মনে করেছেন।আইনি সীমাবদ্ধতা ও হতাশ মনে প্রস্থানভুক্তভোগী স্বামীর এমন করুণ আরজি শুনে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তাকে আইনি বাধ্যবাধকতার বিষয়টি বুঝিয়ে বলেন। ওসি জানান, দেশের প্রচলিত ফৌজদারি আইন অনুযায়ী কোনো সুনির্দিষ্ট অভিযোগ, অপরাধ বা আদালতের পরোয়ানা ছাড়া কোনো স্বাধীন নাগরিককে থানায় আটকে রাখা বা হাজতবাস দেওয়ার কোনো আইনি সুযোগ পুলিশের নেই। অপরাধহীন একজন মানুষকে লক-আপে ঢোকানো আইনের স্পষ্ট লঙ্ঘন।আইনের এমন কঠোর নিয়মের কথা শুনে ওই ব্যক্তির চোখে-মুখে চরম হতাশার ছাপ ফুটে ওঠে। অন্তত কয়েকটা মাস চার দেয়ালের সুরক্ষিত আশ্রয়ে থেকে স্ত্রীদের হাত থেকে রেহাই পাওয়ার যে শেষ আশা নিয়ে তিনি থানায় এসেছিলেন, তা ভেস্তে যাওয়ায় গভীর উদ্বেগ আর দীর্ঘশ্বাস নিয়ে তাকে থানা প্রাঙ্গণ ত্যাগ করতে হয়।সামাজিক সচেতনতার দাবিঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর নেটদুনিয়ায় মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। অনেকে বিষয়টিকে হাস্যরসাত্মক কোণ থেকে দেখলেও, সচেতন সমাজ ও সমাজবিজ্ঞানীদের মতে— এটি আমাদের পারিবারিক কাঠামোর এক মারাত্মক সংকটের প্রতিচ্ছবি। লোকলজ্জার ভয়ে অনেক পুরুষই পারিবারিক নির্যাতনের কথা প্রকাশ করতে পারেন না, যার চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ ঘটে এই ধরনের চরম ও অসহায় পদক্ষেপের মাধ্যমে।
0 মন্তব্যসমূহ