বৃদ্ধাশ্রমে প্রবাসীর বাবার হাহাকার,আমি মারা গেলে সন্তানরা যেন লাশও স্পর্শ না করে



 আমি মারা গেলে আমার সন্তানরা যেন আমার লাশও স্পর্শ না করে। আমি মন থেকে তাদের অভিশাপ দিলাম, তারাও যেন একদিন এই জায়গায় আসে।" বিশ্ব বাবা দিবসে বৃদ্ধাশ্রমে বসে কাঁপা কাঁপা গলায় এক বৃদ্ধ বাবার এমন আকুতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অসংখ্য মানুষের হৃদয় স্পর্শ করেছে। একজন বাবা কতটা কষ্ট, অপমান আর একাকীত্ব বুকে চেপে রাখলে নিজের জন্মদাত্রী সন্তানদের প্রতি এমন ক্ষোভ ও মানসিক যন্ত্রণা প্রকাশ করতে পারেন—তা ভাবিয়ে তোলে সমাজকে।ভিডিওতে অশ্রুসিক্ত চোখে ওই বাবা স্মৃতিচারণ করে বলেন, সন্তানদের তিনি সোনার চামচে করে দুধ তুলে খাইয়েছেন। নিজে না খেয়ে সন্তানদের মুখে অন্ন তুলে দিয়েছেন। নিজের জীবনের সমস্ত সুখ বিসর্জন দিয়ে সন্তানদের সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ে দিয়েছেন। অথচ জীবনের শেষ প্রান্তে এসে আজ সেই বাবার ঠিকানা হয়েছে বৃদ্ধাশ্রমের একাকীত্বে। তিনি আজ সম্পূর্ণ নিঃস্ব ও অসহায়।যৌবনের সব শ্রম ঢেলে দিয়েছিলেন পরিবারের পেছনেজানা যায়, ওই বৃদ্ধ বাবা ২০১৬ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ সময় সৌদি আরবে প্রবাসী ছিলেন। জীবনের সেরা সময়, যৌবনের সব শক্তি ও ঘাম ঝরিয়ে উপার্জিত প্রতিটি টাকা তিনি পাঠিয়েছেন পরিবারের সুখের জন্য। কিন্তু দিনশেষে তার কপালে জুটেছে চরম অবহেলা আর আর্থিক প্রতারণা।তিনি অভিযোগ করে বলেন, তার এক ছেলে প্রবাসে থাকার সময় করা ডিপিএসের (DPS) সব টাকা তুলে নিয়ে উধাও হয়ে গেছে। অন্যদিকে মেয়ের কাছে রাখা ২০ লাখ টাকাও আত্মসাৎ করা হয়েছে। সবচেয়ে কষ্টের বিষয় হলো, আজ টাকা-পয়সা সব হারানোর পর নিজের জন্ম দেওয়া সন্তানেরা কেউ তার সামান্য খোঁজও নেয় না।বাবার কণ্ঠে তখন শুধু হাহাকার ধ্বনিত হচ্ছিল। তিনি বলেন, "আমার টাকা-পয়সাই আজ আমার জন্য কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে।" জীবনের এই চরম শিক্ষা ও সন্তানদের দেওয়া মানসিক নির্যাতনের বিবরণ দিতে গিয়ে তিনি জানান, তিনি একটি ডায়েরি লিখে রেখে যাচ্ছেন। সেখানে তার ওপর হওয়া সব অবিচারের কথা বিস্তারিত লেখা থাকবে।সমাজ ও নৈতিক অবক্ষয়ের প্রশ্নএই ঘটনা বর্তমান সমাজের নৈতিক অবক্ষয়ের এক জ্বলন্ত উদাহরণ। যে বাবা সন্তানদের হাত ধরে হাঁটতে শিখিয়েছেন, নিজের স্বপ্ন বিসর্জন দিয়ে সন্তানদের স্বপ্ন পূরণ করেছেন, শেষ বয়সে এসে তাকে কেন বৃদ্ধাশ্রমে যেতে হবে? এটাই কি আধুনিকতা বা শিক্ষিত সমাজের পরিচয়?বিশ্ব বাবা দিবসে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শুধু লৌকিক স্ট্যাটাস বা পোস্ট দেওয়ার চেয়ে বড় প্রয়োজন মা-বাবার প্রতি দায়িত্ব পালন করা। লোকদেখানো উদযাপনের আগে একবার বাবার পাশে গিয়ে দাঁড়ানো উচিত। যারা দূরে আছেন, তাদের উচিত ফোনটা হাতে নিয়ে অন্তত একবার জিজ্ঞেস করা— "বাবা, তুমি কেমন আছো?"কারণ সময় ফুরিয়ে গেলে হাজারবার ‘বাবা’ বলে ডাকলেও ওপাশ থেকে আর কোনো উত্তর পাওয়া যাবে না। মা-বাবার জীবদ্দশায় তাদের যথাযথ মূল্যায়ন ও যত্ন করাই হোক প্রতিটি সন্তানের মূল দায়িত্ব।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

1 মন্তব্যসমূহ