টোকাই তকমা নিয়ে বেঁচে থাকার লড়াই:ফুটপাথেই ফুরিয়ে যাচ্ছে শৈশব।

 

নিজস্ব প্রতিবেদকঢাকা: যে বয়সে একটি শিশুর কাঁধে থাকার কথা ছিল রঙিন স্কুলের ব্যাগ, হাতে থাকার কথা ছিল নতুন বই আর চোখে রঙিন স্বপ্ন; সেই বয়সে এক টুকরো প্লাস্টিকের বস্তা পিঠে নিয়ে ধুলোবালির শহরে ঘুরছে শিশু রাব্বি। সকালের সূর্য ওঠার পর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত শহরের ডাস্টবিন, রাস্তার মোড় কিংবা রেললাইনের ধার থেকে ভাঙা বোতল, লোহা, কাগজ আর প্লাস্টিক কুড়ানোই এখন তার প্রতিদিনের রুটিন। সমাজ যাকে অবহেলা করে 'টোকাই' বা 'পথশিশু' বলে ডাকে, সেই রাব্বির কাছে এই ময়লা-আবর্জনাই এখন বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন।এটি কেবল রাব্বির একার গল্প নয়; রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন বিভাগীয় ও জেলা শহরগুলোর রেলস্টেশন, বাস টার্মিনাল, লঞ্চঘাট আর ফুটপাথে প্রতিদিন এমন হাজারো জুনায়েদ ও রাব্বির শৈশব পিষে যাচ্ছে নির্মম বাস্তবতার চাকায়। পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া, বাবা-মায়ের বিবাহবিচ্ছেদ, চরম দারিদ্র্য কিংবা নদীভাঙনের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের শিকার হয়ে প্রতি বছর অসংখ্য শিশু বাধ্য হয়ে বেছে নিচ্ছে এই যাযাবর জীবন।জীবনের কঠিন পাঠ ও বেঁচে থাকার নির্মম লড়াইসম্প্রতি রাজধানীর একটি ব্যস্ততম রেলস্টেশনে দেখা মেলে ১০ বছর বয়সী শিশু জুনায়েদের। চেনা ঘরের ঠিকানা হারিয়ে আজ রেলস্টেশনের প্ল্যাটফর্মই তার আশ্রয়, আর শক্ত মেঝেটাই তার বিছানা। সারাদিনের তীব্র ক্ষুধাই তার নিত্যদিনের সঙ্গী। একবেলা খাবারের সন্ধানে তাকে পুরো শহর চষে বেড়াতে হয়। এক সাক্ষাৎকারে জুনায়েদ জানায়, দীর্ঘ সময় অনাহারে থাকার পর এক সহৃদয় ব্যক্তি যখন তাকে এক প্লেট ভালো খাবার কিনে দেন, তখন তার মলিন মুখে যে এক টুকরো সরল হাসি ফুটে উঠেছিল, তা যেন ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে দামি দৃশ্য। সামান্য একটু সহানুভূতি আর ভালোবাসায় একটি সুবিধাবঞ্চিত শিশু কতটা আপ্লুত হতে পারে, তা নিজের চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন।সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, শৈশবের এই কঠিন দিনগুলো শিশুদের মানসিক ও শারীরিক বিকাশে মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। যে বয়সে শিশুর সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন বাবা-মায়ের নিরাপদ কোল, স্নেহ, নিরাপত্তা ও ভালোবাসা, সেই বয়সেই এই শিশুরা শিখে যাচ্ছে অবহেলা কাকে বলে। জীবনের এই নির্মম শিক্ষা তাদের অনেক সময় অল্প বয়সেই সমাজবিমুখ করে তোলে।

পথশিশু সংকটের নেপথ্যে মূল কারণসমূহবাংলাদেশে পথশিশুর সংখ্যা দিন দিন বাড়ার পেছনে সুনির্দিষ্ট কিছু সামাজিক ও অর্থনৈতিক কারণ দায়ী বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। এর মধ্যে অন্যতম প্রধান কারণগুলো হলো:১. চরম দারিদ্র্য: গ্রামীণ ও নগর দারিদ্র্য শিশুদের শ্রমের দিকে ঠেলে দেয়। অনেক পরিবার তাদের সন্তানদের ন্যূনতম অন্ন-বস্ত্রের জোগান দিতে না পেরে শহরের রাস্তায় ছেড়ে দেয়।২. পারিবারিক কলহ ও বিচ্ছেদ: বাবা-মায়ের মধ্যে নিয়মিত অশান্তি, বিবাহবিচ্ছেদ কিংবা বাবা বা মায়ের দ্বিতীয় বিয়ের পর অনেক শিশু পরিবারে চরম অবহেলার শিকার হয় এবং একপর্যায়ে ঘর থেকে পালিয়ে যায়।৩. প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও জলবায়ু পরিবর্তন: নদীভাঙন, বন্যা ও সাইক্লোনের মতো দুর্যোগের কারণে প্রতি বছর হাজার হাজার পরিবার নিঃস্ব হয়ে শহরে এসে বস্তিবাসী হয়। এই পরিবারগুলোর শিশুরাই পরবর্তীতে পথশিশুতে পরিণত হয়।৪. পাচারকারী চক্রের ফাঁদ: প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে অনেক শিশুকে ভালো কাজের প্রলোভন দেখিয়ে শহরে এনে ভিক্ষাবৃত্তি বা ঝুঁকিপূর্ণ শ্রমে বাধ্য করে একশ্রেণীর অসাধু চক্র।পুষ্টিহীনতা, স্বাস্থ্যঝুঁকি ও অপরাধের অন্ধকার জগতরাস্তায় বসবাসকারী এই শিশুদের সিংহভাগই তীব্র পুষ্টিহীনতায় ভোগে। ডাস্টবিন বা পচা-বাসি খাবার খেয়ে বেঁচে থাকার কারণে ডায়রিয়া, চর্মরোগ, টাইফয়েড এবং জন্ডিসের মতো মারাত্মক ব্যাধি এদের শরীরে বাসা বাঁধে। সরকারি বা বেসরকারি পর্যায়ে এদের জন্য স্থায়ী কোনো চিকিৎসাব্যবস্থা না থাকায় সামান্য অসুস্থতাও অনেক সময় এদের জন্য প্রাণঘাতী হয়ে দাঁড়ায়।এর চেয়েও বড় শঙ্কার বিষয় হলো, সঠিক দিকনির্দেশনা ও স্নেহের অভাবে এই শিশুরা খুব সহজেই অপরাধ জগতের দিকে ধাবিত হয়। মাদক ব্যবসায়ী, পকেটমার ও রাজনৈতিক দলগুলো অনেক সময় এই অবুঝ শিশুদের নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করে। সস্তা ও সহজলভ্য মাদক যেমন ‘ড্যান্ডি’ (আঠা জাতীয় এক প্রকার মাদক) সেবনে আসক্ত হয়ে পড়ছে সিংহভাগ পথশিশু। এই মাদক তাদের ক্ষুধা ও কষ্টের অনুভূতি সাময়িকভাবে ভুলিয়ে রাখলেও ধীরে ধীরে তাদের মস্তিষ্ক ও লিভার ধ্বংস করে দিচ্ছে।নাগরিক সমাজের বৈপরীত্য: একদিকে অপচয়, অন্যদিকে অনাহারআমাদের নাগরিক সমাজে প্রতিদিন প্রচুর পরিমাণে খাবার অপচয় হচ্ছে। বিয়েবাড়ি, রেস্তোরাঁ কিংবা বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে বেঁচে যাওয়া টন টন খাবার প্রতিদিন ডাস্টবিনে ফেলে দেওয়া হয়। অথচ এই একবিংশ শতাব্দীতে এসেও একই দেশের রাজপথে অসংখ্য শিশু একবেলা খাবারের জন্য কাকডাকা ভোর থেকে রাত পর্যন্ত অপেক্ষা করে থাকে।আমরা যদি আমাদের প্রতিদিনের অপচয় করা খাবারের সামান্য অংশও সুপরিকল্পিতভাবে এই নিরন্ন শিশুদের মাঝে বিলিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করতে পারতাম, তবে হয়তো কোনো জুনায়েদকে ক্ষুধার্ত পেটে প্ল্যাটফর্মের শক্ত মেঝেতে ঘুমাতে হতো না। আমাদের একটু সচেতনতা, একটু সহানুভূতি এবং সদিচ্ছাই পারে এই পথশিশুদের ক্ষুধার তীব্র কষ্ট দূর করতে।সরকারি উদ্যোগ ও বাস্তবায়নের ফাঁকফোকরজাতীয় বাজেটে প্রতি বছরই পথশিশু এবং সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের পুনর্বাসন, শিক্ষা ও সুরক্ষার জন্য নির্দিষ্ট পরিমাণ ফান্ড বা অর্থ বরাদ্দ রাখা হয়। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় এবং মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্র ও সেফ হোম পরিচালিত হচ্ছে। তবে বাস্তব চিত্র বলছে, তৃণমূল পর্যায়ে এই উদ্যোগগুলোর সঠিক এবং টেকসই বাস্তবায়ন এখনো অনেক দূরে।সমাজকর্মীদের মতে, শুধু সরকারি পুনর্বাসন কেন্দ্রের ওপর নির্ভর করে এই বিশাল সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। অনেক সময় দেখা যায়, আশ্রয়কেন্দ্রের কঠোর নিয়মের কারণে বা পর্যাপ্ত স্বাধীনতার অভাবে শিশুরা পুনরায় রাস্তায় ফিরে আসে। তাই শুধু চার দেয়ালের মাঝে আটকে না রেখে তাদের মানসিক বিকাশ, কাউন্সেলিং এবং কারিগরি শিক্ষার মাধ্যমে পুনর্বাসন করা জরুরি।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ